চলুন জেনে নেই ওয়াইফাই WiFi সিগন্যাল বুস্ট করার মজার কিছু পদ্ধতি

বর্তমানে ওয়াইফাই WiFi Router এর সাথে পরিচিত নেই এমন লোক পাওয়া মুশকিল। ঘরে ঘরে এখন ওয়াইফাই ( WiFi ) ইন্টার নেট সংযোগ প্রতিস্থাপিত হচ্ছে। দিন দিন এর চাহিদাও প্রচুর পরিমানে বেড়ে চলছে। প্রযুক্তির চাহিদা মিটাতে তাই আজ আমি হাজির হলাম ওয়াইফাই WiFi সিগন্যাল বুস্ট সম্পর্কিত কিছু তথ্য নিয়ে। আশা করি ওয়াইফাই WiFi কি? এর সংগা না দিলেও চলবে। আমরা অনেক সময় দামি দামি ওয়াইফাই WiFi Router কিনেও এর খুব বেশি সিগন্যাল পাই না। কারন এর কনফিগারেশন এর ব্যাপারে আমাদের পর্যাপ্ত ধারনা খুব কম। তো চলুন জেনে নেই ওয়াইফাই WiFi সিগন্যাল বুস্ট করার মজার কিছু পদ্ধতি-

 

০১) অপটিমাল রাউটার প্লেসমেন্ট!

অপটিমাল রাউটার প্লেসমেন্ট বলতে আমি আপনার রুমের এমন একটি নির্দিষ্ট জায়গাকে চিহ্নিত করতে বুঝিয়েছি যেখানে রাউটারটি রাখলে আপনার বাসায় সকল রুমেই সমানভাবে রাউটারটি সিগন্যাল পাঠাতে পারবে। একটি রুমের সকল অংশই কিন্তু সমান নয়! ঠিক এটাই রাউটারের ক্ষেত্রেও সমান ভাবে প্রযোজ্য! প্রথমে রাউটারটিকে CPU এর উপরে রেখে দেখতে পারেন সিগন্যাল কেমন পায় পরের রুম থেকে, আবার সাউন্ড বক্সের কাছে রেখেও টেস্ট করতে পারেন। আবার রাউটারের তার বড় ধরনের হলে রুমে বিভিন্ন স্থানে রাউটারটি নিয়ে গিয়ে এর সিগন্যালের টেস্ট করতে পারেন। এভাবে টেস্ট করিয়ে নিয়ে আপনার রুমের বেস্ট একটি স্থানকে চিহ্নিত করুন যেখান থেকে আপনার বাসায় সকল স্থানেই সমান এবং ভালো (WiFi) ওয়াইফাই এর সিগন্যাল পাওয়া যায়। আবার রাউটারের এনটেনা আছে বিধায় সব-সময়ই যে রাউটারকে জানালার পাশে সেট করলেই কাজ হবে এমনটাও কিন্তু না!

সাধারণত ওয়ারলেস রাউটারগুলোর ওপেন স্পেসের প্রয়োজন হয় সঠিক ভাবে কার্যাবলি সম্পাদন করার জন্য। কিন্তু আমাদের বাসা বাড়িতে দেয়াল এবং কর্নার থাকার কারণে এই পরিমাণের ওপেন স্পেস আমাদের ক্ষেত্রে সরবরাহ করাটা সম্ভব হয়ে উঠে না। অন্যদিকে আমাদের অফিসেও একই কথা বলা যেতে পারে। তবে  সবসময় ওপেন স্পেস ছাড়াও রাউটারের আশে পাশে অতিরিক্ত পরিমাণের হেভি ডিউটি জাতীয় ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস থাকলেও রাউটারের পারফরমেন্সে উত্থান-পতন হতে পারে। তাছাড়াও আপনার রাউটারে যদি এক্সটারনাল এন্টেনা থেকে থাকে তাহলে সেগুলোকেও এদিক-ওদিক ভাবে বসিয়েও আপনি সঠিক মুভমেন্টটির টেস্টিং করতে পারেন। টেস্টিংয়ের ক্ষেত্রে আপনি বিভিন্ন ভিজুয়্যাল নেটওয়ার্কিং সফটওয়্যারের সাহায্য নিতে পারেন। Heatmapper, inSSIDer for workplace, Netgear’s WiFi Analytics ইত্যাদি সফটওয়্যারের সাহায্য আপনি নিতে পারেন।

 

০২) ফ্রিকোয়েন্সি সেটিং করে নিন!

নিজস্ব রাউটারের ফ্রিকোয়েন্সির সাথে রাউটারের সফটওয়্যার টিকে এডজাস্ট করে নিতে পারেন ভালো সিগন্যালের পাবার জন্য। আপনার রাউটারের এই কাজটি করে নিলে ফ্রিকোয়েন্সি অপটিমাইজেশন এর ফলে ভালো রেজাল্ট পেতে পারে। আপনার রাউটারটি যদি ডুয়াল ব্যান্ড রাউটার হয় তাহলে ADMIN পেজে 2.4GHz band এর জায়গায় 5GHz Band সেটিংয়ে সুইট করিয়ে নিতে পারেন। কারণ বর্তমানেও ৫ গিগাহার্জের ফ্রিকোয়েন্সি ডিভাইস খুব কমই দেখা যায় এবং এর কারণে আপনি অন্যসব ওয়্যারলেস ডিভাইসের সিগন্যালের সাথে আপনার রাউটার এর সিগন্যাল ক্রসচেক হবে না এবং ফলাফলসরুপ আপনি ভালো সিগন্যাল পেতে পারেন।

 

০৩) রাউটার ফার্মওয়্যার আপগ্রেড করুন:

বর্তমানে প্রায় প্রত্যেকটি আধুনিক ও ডিজিটাল ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস গুলোকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। একটি হলো হার্ডওয়্যার এবং অপরটি হলো সফটওয়্যার! যা হয় তো আমরা জেনে থাকি। ওয়াইফাই (WiFi) রাউটারও এর ব্যতিক্রম নয়। হার্ডওয়্যার এর ক্ষেত্রে আমরা তেমন কিছুই করতে পারি না কিন্তু সফটওয়্যারটির নিয়ন্ত্রণ কিন্তু আমাদেরই হাতে দেওয়া থাকে।

সাধারণত আপনার ওয়াইফাই রাউটার এর সিগন্যাল কম বা কোনো সমস্যার কারণ হিসেবে হতে পারে আপনার রাউটার এর ফার্মওয়্যার আউটডেটেড অথবা ব্যাকডেটেড! রাউটার ম্যানুফেকচাররা প্রতিনিয়তই তাদের রাউটার এর সফটওয়্যারের আপডেট দিয়ে থাকে, যেখানে বিভিন্ন বাগ ফিক্সিং এবং পারফরমেন্স বৃদ্ধির কিছু কাজও থাকে। তাই আপনি প্রথমে আপনার ওয়াইফাই রাউটারের ফার্মওয়্যারকে আপগ্রেড দিতে পারেন। আপনার রাউটার রত ফার্মওয়্যার আপগ্রেড প্রসেসিং ঠিক কতটুকু সহজ কিংবা কতটুকু কঠিন হবে সেটা আপনার রাউটার ডিভাইসের ম্যানুফেকচার ও মডেলের উপর নির্ভর করে থাকে। চাইনিজ এসকল রাউটারের অধিকাংশেই রাউটার আপগ্রেডের কোনো সুযোগ নেই। কারন এরা এগুলোকে ওয়ান টাইম ইউজের জন্যেই কমমূল্যে বানিয়ে থাকে।

 

আবার অরিজিনাল ও ব্রান্ডের বর্তমান যুগের রাউটার এর ADMIN পেজেই আপনি রাউটারের ফার্মওয়্যার আপগ্রেডের করার অপশনটি দেখতে পাবেন। আর পুরাতন মডেলের রাউটারগুলোতে আপনাকে ম্যানুয়াল ভাবে নিজে নিজেই রাউটারের মডেল দিয়ে নেট থেকে ফামওর্য়াড আপগ্রেডক ফাইল ডাউনলোড করে নিয়ে তারপর আপডেটিং করতে হতে পারে। তো এখন ত্থেকে রাউটারের সিগন্যাল বুস্ট সহ ভালো পারফরমেন্সের জন্য আপনি আপনার রাউটারটিকে নিয়মিত আপডেট চেক করতে পারেন।

 

০৪) কোয়ালিটি কনট্রোল!

প্রায় সকল মর্ডান রাউটারগুলো Quality-of-Service (QoS) টুলস সহ এসে থাকে। এর মাধ্যমে আপনি প্রায় সকল অ্যাপস কতটুকু ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করবে সেটা নির্ধারণ করে দিতে পারবেন। এই টুলসগুলো আপনার জন্য দরকারী হবে যদি আপনি ভিডিও স্ট্রিমি বা voice over IP (VoIP) বেশি পরিমাণের ব্যবহার করে থাকেন। যেমন স্কাইপে আপনি একটি জরুরী ভিডিও কলের ভিতর আছেন কিন্তু ওই দিকে আপনার ছোট ভাই মোবইলে ওয়াইফাইয়ের মাধ্যমে ডাউনলোড করছে! এই রাউটারের এই জাতীয় টুলের মাধ্যমে আপনার রাউটারের কোন সফটওয়্যারটিকে বেশি প্রাধান্য (priority) দিবেন সেটি নির্ধারণ করে দিতে পারেন। বিশেষ করে একই অফিসের সবার জন্য যখন একটি রাউটার বরাদ্দ থাকে তখন এডমিন হিসেবে আপনি এই জিনিস করে নিয়ে পারেন। QoS সেটিংটি আপনি আপনার রাউটার এডমিন পেজের network’s administration এর advanced settings এর ভিতর পাবেন।

 

০৫) চ্যানেল পরিবর্তন

ওয়াকি টকি নিয়ে ছোটবেলার খেলেছেন কখনো? যদি খেলে থাকেন তাহলে ওয়াকি টকির একটি বৈশিষ্ট্য এর ব্যাপারে নিশ্চয় জেনে থাকবেন যে ওয়াকি টকিতে বিভিন্ন চ্যানেলের মাঝে সুইচ করার অপশন থাকে। আপনার চ্যানেল এবং যার সাথে ওয়াকি-টকিতে কথা বলবেন তার চ্যানেল এক না হলে, আপনারা কারো কথাই শুনতে পারবেন না। এমনকি অনান্য চ্যানেলে সুইচিং করিয়ে নিয়ে অন্যদের ওয়াকি টকির কথাও আপনি চাইলে শুনতে পারবেন! একই প্রসেস আমরা বিভিন্ন Baby Monitor য়েও দেখতে পাই।

একই ভাবে মর্ডান রাউটারগুলোও মাল্টি চ্যানেল বিশিষ্ট হয়ে থাকে। তাই রাউটারগুলো আপনার ডিভাইসে সঠিক ভাবে তথ্য বা ডাটা আদানপ্রদানের জন্য বিভিন্ন চ্যালেনের মধ্যে সুইচিং করতে থাকে। কিন্তু আপনার প্রতিবেশির বাসার রাউটারটিও যদি একই চ্যানেল এর হয়ে থাকে তবে আপনি এবং আপনার প্রতিবেশি দুজনই সিগন্যালে সমস্যা পাবেন।

উইন্ডোজ কমান্ড প্রোমোটে netsh WLAN show all কমান্ডের মাধ্যমে আপনি আপনার এবং আপনার প্রতিবেশীদের নেটওর্য়াকের চ্যানেলগুলোকে দেখতে পাবেন। সাধারণত বাসার রাউটারগুলো চ্যানেল ৬ এবং চ্যানেল ১১ ব্যবহার করে থাকে।

 

০৬) এন্টেনা রিপ্লেস করুন।

আপনার রাউটারের যদি ইন্টারনাল এন্টেনা থাকে তাহলে একটি বা দুটি এক্সটারনাল এন্টেনা লাগিয়ে নিতে পারেন পারফরমেন্স বুস্টের জন্য। কিংবা এক্সটানাল এন্টেনাটি পুরোনো কিংবা ভেঙ্গে গেলে নতুন এন্টেনা কিনে এনে রিপ্লেস করে দেখতে পারেন পারফরমেন্স কিছুটা ভালো পান কিনা। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই পদ্ধতিটি অরিজনাল ব্রান্ডের ও দামী রাউটারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য! কারণ বাজারে হাজার দুয়েকের চাইনিজ রাউটারগুলোর এন্টেনা আপনি খুঁজেই পাবেন না। আর দু হাজারে নতুন রাউটার পেলে এই এন্টেনা রিপ্লেসের ঝামেলায় আপনি নিশ্চয় যেতে চাইবেন না!

 

০৭) ওয়্যারলেস রেঞ্জ এক্সটেনডার ব্যবহার করুন।

অফিসের / বাসার রুমের সাইজ বেশি বড় হয়ে গেলে আপনি এই ওয়্যারলেস রেঞ্জ এক্সটেনডার ব্যবহার করতে পারেন। এর মাধ্যমে আপনি আপনার রাউটারে সিগন্যাল রেঞ্জ ড্রামাটিকভাবে বৃদ্ধি করে নিতে পারবেন। এই ডিভাইসকে Wireless range Extender, Wireless Repeater, Wi-Fi Expander নামেও আপনি বাজারে পেতে পারেন। রেঞ্জ এক্সটেনডারগুলো সাধারণ রাউটারের মতোই দেখতে কিন্তু এদের কাজগুলো একদম ভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। এদের কাজ হলো আপনার রাউটার এর ওয়াইফাইয়ের ওয়্যারলেস সিগন্যালকে ক্যাপচার করে আবারো তাদের মধ্যে দিয়ে সিগন্যাল প্রচার করে থাকে এবং ফলাফল সরুপ  রাউটারের সিগন্যালকে বৃদ্ধি করে থাকে। ডিজিটাল ভাবে রেঞ্জ এক্সটেনডারকে আমরা একই সিগন্যালের আরেকটি আইপি এড্রেসযুক্ত ক্লায়েন্ট বলতে পারি।

আপনার রাউটার এর মডেল অথবা একই ব্রান্ডের এক্সটেনডার কিনতে হবে এমন কোনো কথা নেই তবে আপনার রাউটারের সিগন্যালের ফ্রিকোয়েন্সি সাথে মিল রেখে যেকোনো ব্রান্ডের সিগন্যাল এক্সটেনডার আপনি কিনে নিতে পারেন।

 

০৮) উচ্চমানের ওয়াইফাই সিস্টেম!

রেঞ্জ এক্সটেনডার ব্যবহার করে আপনি আপনার রাউটার এর মুল সিগন্যালের প্রায় দ্বিগুণ বেশি রেঞ্জ পেতে পারেন। কিন্তু আপনার যদি আসলেই অনেক জায়গা কভার করার প্রয়োজন হয় তাহলে আপনার এই সকল রাউটার আর এক্সটেনডারের উপর নির্ভরশীলতাকে বাদ দিতে হবে। আর আপনাকে টাকা পয়সা খরচ করে Mesh-Based Wi-Fi সিস্টেম বানিয়ে নিতে হবে। কিংবা বাসার জন্য মিডিয়াম সাইজের ওয়াইফাই সিস্টেম কিনে নিতে পারেন।

রাউটারের চেয়ে ওয়াইফাই সিস্টেমগুলো বাসার দেয়াল প্রতিটি কর্নারেও একই ভাবে সিগন্যাল পাঠিয়ে থাকে আর আপনি পান নিরবিচ্ছিন্ন সিগন্যাল কোয়ালিটি। বাসার প্রতিটি দেয়ালের কর্নারে স্যাটালাইট মডিউল বাসানো থাকে যেগুলো সরাসরি আপনার মেইন রাউটারের সাথে সংযুক্ত থাকে এবং এরা সকলই একটি সিঙ্গেল ওর্য়ারলেস নেটওর্য়াকের সাথে সংযুক্ত থাকে। বাসার বা অফিসের সাইজ যত বড় হবে বা যতগুলো রুম থাকবে ততগুলো নোডের প্রয়োজন হবে। যার ফলে আপনার খরচের পরিমাণও অনেকটা বৃদ্ধি পাবে। মূলত এটাই হচ্ছে এই পদ্ধতির মূল সমস্যা!

০৯) রাউটারের খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করুন!

বর্তমান যুগের বিভিন্ন লিডিং রাউটারগুলো যেমন Linksys, Netgear, TrendNET, TP-Link, Netis, Mi, D-Link রাউটারগুলো সবই DD-WRT রাউটার অপারেটিং সিস্টেম দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে। অথবা আপনার রাউটারটি এই অপারেটিং সিস্টেম না হয়ে থাকে, তাহলে সহজেই নেট থেকে DD-WRT ডাউনলোড করে আপনার রাউটার এর ফার্মওয়্যারে ইন্সটল করে নিতে পারেন। এই অপারেটিং সিস্টেমের মাধ্যমে আপনি বিভিন্ন নেটওর্য়্যাক টুইকিং করতে পারবেন। এবং এদের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে আপনি আপনার রাউটার এর পারফরমেন্স ও রেঞ্জ বৃদ্ধি করে নিতে পারবেন। বিঃদ্রঃ কাজে ভুল হলে অনেক সময় আপনার রাউটারটি হয় তো নষ্টও হয়ে যেতে পারে, কাজেই এটা সম্পূর্ণ নিজ রিস্কে করবেন।

তো এই ছিলো আমাদের রাউটারের ওয়াইফাই সিগন্যাল বৃদ্ধি করার প্রধান এবং চমৎকার কিছু পদ্ধতি। আশা করি এই পদ্ধতিগুলো আপনাদের কাছে ভালো লেগেছে। এবং পদ্ধতিগুলো নিজে একবার ট্রাই করে কমেন্ট বক্সে ফলাফল আমাদের সাথে শেয়ার করতে পারেন। আজ তাহলে এ পযর্ন্তই থাকুক। আগামী টিউনে অন্য কোনো টপিক নিয়ে আমি চলে আসবো আপনাদেরই প্রিয় HatHostBD তে। টিউনটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ!

Was this helpful?

0 / 0

Leave a Reply 0

Your email address will not be published. Required fields are marked *